মরুর সিংহ : ওমর মুখতার

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে নড়বড়ে ওসমানীয় খেলাফতের যুদ্ধে পরাজয় আর জায়গা হারানো ছিল নিয়মিত ঘটনা। ১৯১২ সালে “Italo-Turkish War” এ ওসমানীদের পরাজয়ের পর লিবিয়ায় দখলদারিত্ব কায়েম করে মুসোলিনির ইটালি।

চলতে থাকে অসভ্যতা-বর্বরতা আর অন্যায়- জুলুম। তপ্ত মুরুর বুকের অসহায় মানুষগুলো ধুকে ধুকে মরছিল বিভিন্ন নির্যাতন ক্যাম্পে।

তখন সিংহের মত গর্জন করে মুসোলিনির সৈন্যদের সামনে এসে দাড়ালেন আল্লাহর এক বান্দা। তিনিই ওমর মুখতার (রাহ)। মরুর সিংহ। ১৮৬২ সালে উসমানীয় খিলাফতের অধীনস্ত আফ্রিকার একটি ছোট শহরের এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম। শৈশবেই বাবা-মা দুজনকে হারান মুখতার। পরে তাকে দত্তক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন শারিফ আল গারিয়ানি নামের এক ব্যক্তি। মুখতারের প্রাথমিক শিক্ষা শেষ হয়েছিল স্থানীয় মসজিদে ও মক্তব্যে। পরে তিনি সুফিদের আন্দোলন সেনুসির মূলকেন্দ্র জাগবুবের সেনুসি বিশ্ববিদ্যালয়ে আট বছর শিক্ষালাভ করেন। ছিলেন কোরআনে হাফিজ। তিনি রাতে তিন ঘন্টার বেশী ঘুমাতেন না, রাতের শেষ তৃতীয় ভাগে আল্লাহ সুবহানাহু তাআলার ইবাদতের উদ্দেশ্যে উঠতেন। তখন থেকে ফজরের আগ পর্যন্ত কুরআন তিলাওয়াত করতেন। প্রতি সাতদিনে একবার সম্পূর্ণ কুরআন পড়ে শেষ করা ছিল আজীবনের অভ্যাস। শিশুদের কে নিয়মিত তিনি কুরআন শেখাতেন।

‘মরুর সিংহ’ উপাধি পেয়েছিলেন অল্প বয়সেই, সে কাহিনীও বেশ মজার। একবার এক কাফেলার সাথে সুদান যাচ্ছিলেন। যাত্রাপথের একটি সরু রাস্তা রোধ করে একটি বিরাট সিংহ দাঁড়িয়েছিল। কাফেলার সবাই আতংকিত হয়ে ছুটোছুটি করতে থাকে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে সকলেই। অবশেষে সবাই মিলে ঠিক করলো যে, সিংহটিকে একটি উট দেয়া হবে; যাতে উটটি নিয়ে সে তাদের পথ ছেড়ে চলে যায়। এই অবস্থায় তিনিই তাঁর করণীয় ঠিক করে নেন। তিনি তার শট গানটি নিয়ে ঘোড়ার উপর চড়ে বসলেন এবং সিংহটির দিকে এগিয়ে গেলেন। সবার চোখ কপালে উঠে গেল, কিছুক্ষণ পর তিনি সিংহটির মাথা নিয়ে ফিরে এলেন। তার সাহসিকতায় মুগ্ধ হয়ে লোকেরা তাকে উপাধি দেয় “সিয়েরানিকার সিংহ”।

১৯১১ সালের অক্টোবরে ইতালির ঔপনিবেশিক সেনারা লিবিয়ার ত্রিপোলি শহরের সমুদ্রতীরে গিয়ে পৌঁছে লিবীয়দের জানায়, হয় তারা আত্মসমর্পণ করবে ইতালির কাছে, নয়তো পুরো শহর গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।

কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ালেন ওমর মুখতার আর তার বাহিনী। এর আগেও তিনি বনু সানুস গোত্রের সাথে জোট বেঁধে প্রথমে ফ্রেঞ্চ এবং পরে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। মক্তব-শিক্ষক ওমর মুখতারের নেতৃত্বে লিবীয়দের সশস্ত্র গেরিলা-যুদ্ধ ইতালীয়দের চুড়ান্ত নাকানিচুবানি খাইয়ে ছাড়ল।

মরুভূমিতে গেরিলা যুদ্ধের কলাকৌশলে তিনি ছিলেন অনন্য। এছাড়া সমস্ত মরু এলাকা নখদর্পণে থাকায় তিনি ইতালীয়দের কাছে হয়ে উঠেন মূর্তিমান আতংক। লিবিয়ার ভয়াবহ মরুভূমির বুকে ইটালির দখলদারদের উপর প্রায়ই মরু ঈগলের মত ঝাপিয়ে পড়তেন। সিংহের মত দাবড়িয়ে বেড়িয়েছেন মুসোলিনির জালেম অফিসারদের উপর। একসময় রোমে শুধু একটি নামই উচ্চারিত হতো, মোস্ট ওয়ান্টেড ওমর মুখতার! লিবিয়ার মুক্তিকামী মুসলমান বেদুঈনদের নয়নের মণি হয়ে উঠেছিলেন এই সাদামাটা লোকটি।

সংঘর্ষ এড়াতে ইতালিয়ানরা তাকে উচ্চ পদ এবং সম্পদের লোভ দেখায়। বিনিময়ে তাকে আত্মসমর্পণ করে তাদের আনুগত্য মেনে নেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়। এর জবাবে তিনি তার বিখ্যাত উক্তিটি করেন, “আমি কোন মজাদার খাবার নই যে, কেউ চাইলেই আমাকে গিলে ফেলবে। তারা আমার আদর্শ-বিশ্বাসকে টলাতে যতই অপচেষ্টা করুক, আল্লাহ তাদের পরাজিত করেই ছাড়বেন।”

তারা হাল ছেড়ে দিয়ে ফিরে যায়। পরবর্তী অভিযানের শুরুতে তাকে আবার প্রস্তাব দেওয়া হয়, তিনি যদি তার এলাকা ছেড়ে তাদের কাছে চলে আসেন, তাহলে তিনি অর্থ-বিত্ত সহ বিলাসী জীবন যাপনের সকল সুবিধা পাবেন। কিন্তু তিনি আবার এই বলে প্রত্যাখ্যান করেন, “কখনোই না, আমার প্রভুর সাথে মিলিত হওয়ার আগে আমি কিছুতেই এই মাটি ত্যাগ করবো না। আমার কাছে মৃত্যুর চেয়ে প্রিয় আর কিছুই নেই। আমি তো প্রতি মূহুর্তেই তার জন্য অপেক্ষা করে আছি।”

বয়সের ভার তাকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখতে পারেনি। দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে এই মানুষটিই ছিলেন তার দেশের মানুষের আশার কেন্দ্রস্থল। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র সমৃদ্ধ হাজার হাজার সৈন্য আর যুদ্ধবিমানের বিপরীতে তার ছিল কয়েকটি ঘোড়া, সাধারণ রাইফেলধারী কিছু লোক, যারা পাহাড়ে পাহাড়ে উপোস ঘুরে বেড়াচ্ছিল। উম্মাহর অন্যান্য সাহসী সেনাপতিদের মতোই, তার শক্ত অবস্থান আর তেজোদ্দীপ্ত কথায় লোকেরা তার পাশে জড়ো হতে থাকে। তিনি ইতালিয়ানদের দূর্বল জায়গাগুলো খুঁজে বের করে তাতে আঘাত হানতে শুরু করেন। যারা ভেবেছিল, মুসলিম দেশগুলো দখল করতে কোন বেগই পেতে হবে না, তারা এবার প্রচণ্ড ধাক্কা খেল। ইতালীয় ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে মুখতারের প্রায় ২০ বছরব্যাপী লড়াই চালিয়ে যান।

শেষের দিকে বনু সানুস গোত্রের অনেক সহযোদ্ধারা সাধারণ ক্ষমা, মাসিক স্যালারি ও ট্যাক্স থেকে অব্যাহতির শর্তে ইতালীয়ানদের সাথে হাত মিলালেও ওমর বিন্দুমাত্র টলেননি। কেন তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি শুধুমাত্র ইসলামের জন্য যুদ্ধ করছেন। কাফিরদের দখলদারিত্ব থেকে মুসলিম ভূমি রক্ষা করাকে তিনি ফরজ মনে করতেন। আল্লাহর শত্রুদের সাথে তিনি কোন ধরনের আপোষ করতে অস্বীকৃতি জানান।

অবশেষে ১৯৩১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর এক অভিযানে তার ঘোড়াকে গুলি করে হত্যা করা হলে তিনি বন্দী হন। যে অফিসার তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলো সে বলে, “তাকে যখন আমার অফিসে হাজির করা হয়, তাকে অন্য সব মরুযোদ্ধাদের মতোই ভেবেছিলাম। তার হাত ছিলো শিকলবদ্ধ। অবিরাম যুদ্ধ করতে করতে তার শরীরের অনেক হাড়গোড়ই ভেঙ্গে গিয়েছিল। একারণে তার হাঁটতেও খুব কষ্ট হচ্ছিলো।

কিন্তু এত কিছুর পরও তাকে কোন সাধারণ সৈনিকের মত লাগছিলো না। তিনি সোজা হয়ে দাঁড়ালেন এবং ধীর শান্ত কণ্ঠে প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন। তার চেহারায় সূর্যের মত দ্যুতি আমার মনে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিল। কথোপকথনের শেষ ভাগে আমার ঠোঁট কাঁপতে শুরু করে। আমি তাড়াতাড়ি জেরা শেষ করে তাকে পরের দিন কোর্টে হাজির করার নির্দেশ দিই। ইতালীয়ানরা তাকে চিনতে পেরে অবাক হয়ে যায়।তাকে বেনগাজীতে প্রেরণ করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *