“বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাসে ট্যাবু যিনি”

|| এক ||

বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাসে তিনি কেমন যেন ট্যাবু হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর কবিতা এবং নামের গায়ে প্রতিক্রিয়াশীলতার সিল আঁটা পড়েছে। এ থেকে কেউ কেউ মরিয়া হয়ে তাঁকে মুক্ত করতে চান। আবার কেউ কেউ তাঁকে বারবার এদিকেই ঠেলতে চান। ঠেলাঠেলির সংস্কৃতির মধ্যে তাঁকে চেনা একটু মুশকিলই বটে।

এহেন ঠেলাঠেলির মাঝখানে ফেলে আমরা তার প্রতি অবিচার করেছি। শুধু অবিচার নয়, তাঁকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়ার বন্দোবস্তও করা হয়েছিলো। জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি অবর্ণনীয় কষ্টে কাটিয়েছেন। কপাল ভালো যে তিনি আত্মহত্যার পথ বেঁছে নেননি।

তাঁর চাকরী কেড়ে নেয়া হয়েছিলো, যার দরুন অর্থাভাবে বিনা চিকিৎসায় তাঁর আদরের কন্যাটি মারা যায়। তাঁকে শেষ বয়সে না খেয়ে, না পরে, যাপন করতে হয়েছে অমানবিক জীবন। এমনকি মৃত্যুর পূর্বে এ শহরের বুকে তার কবর দেয়ার জন্য এক টুকরো জমিও রেখে যেতে পারেননি। এক দয়ালু কবি এগিয়ে না এলে এই শহরে তাকে হয়তো গণকবরস্থানেই দাফন করা লাগতো। কিন্তু কেন?

|| দুই ||

এতটুকু শুনে নিশ্চয়ই এই বিখ্যাত ব্যক্তির নামটি জানতে ইচ্ছা করছে। – হ্যাঁ, বলছি। তিনি আর কেউ নন, আমাদের সবার চেনাজানা ‘সাত সাগরের মাঝি’ ‘সিরাজাম মুনীরা’ ‘নৌফেল ও হাতেম’ কিংবা ‘হাতেম তা’য়ী’র মতো বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থের স্রষ্টা প্রিয় কবি “ফররুখ আহমদ”।

নামটি শুনে হয়তো একটু নড়েচড়ে বসছেন, তাহলে আরো একটু শুনুন, তিনি মূলত ছিলেন সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার মানুষ, পরবর্তিতে যিনি ইসলামী রেনেসাঁর অগ্রদূত হিসেবে আবির্ভূত হন। ভাষা আন্দোলনের কলম সৈনিক এই মহান ব্যক্তির শেষ জীবন এত লাঞ্চনার ছিলো কেন?

উত্তরটা আহমদ ছফার ভাষায় দিই- “তিনি অন্যান্য বিশ্বাসঘাতকের মতো স্লোগান বদল করতে পারেননি। সৎ কবিরা অনেক সময় ধরতাই বুলিতে গা ঢেলে দিতে পারেন না। সেটাই তাঁদের একমাত্র অপরাধ। কবি ফররুখ আহমদও এই একই অপরাধে অপরাধী।”

তিনি তার কবিতায় আরবী ফার্সী শব্দমালা গেঁথে ইসলামকে ফুটিয়ে তুলতেন। রবিঠাকুরের বিরুদ্ধেও স্বাক্ষর করেছিলেন একবার। আরো অভিযোগ ছিলো তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা আন্দোলনে কবিতার মাধ্যমে ভূমিকা রেখেছিলেন।

এহেন অভিযোগে তাঁকে শেষ করে দেয়া হয়। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়- তার সমসাময়িক কালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় কথা বলেননি এমন কয়জন আছেন?

কবি শামসুর রহমান, সুফিয়া কামাল থেকে শুরু করে সৈয়দ আলী আহসান, আবদুল গণি হাজারী, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, সিকান্দার আবু জাফর, মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা, মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহসহ- ততকালীন সেরা সেরা কবিরা সবাই পাকিস্তানি আবেগ নিয়ে রচনা করেছেন কবিতার পর কবিতা। ঐ সময়ের মাসিক সওগাত, মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকাগুলো ঘাটাঘাটি করলেই প্রমাণ মিলবে।

অন্যদের বেলায় সম্মানজনক স্থান, কিন্তু কবি ফররুখের প্রতি কেন এমন বিমাতাসূলভ আচরণ?

|| তিন ||

যাক, ঐ দিকে আর না যাই। ফররুখ পাঠকমাত্রই এটা সহজে অনুমেয়। তবে এতটুকু বলতে পারি- ফররুখ আহমদ তার কাব্যচর্চার মাধ্যমে নিজ বিশ্বাস এবং আদর্শ ফুটিয়ে তুলতেন। তিনি ইসলামী আদর্শ ও মুসলিম ইতিহাস নির্ভর প্রচুর কবিতা লিখেছেন। ফররুখ আহমদ তার কবিতার মাধ্যমে মুসলিম জাতিকে উত্থানের পথ দেখিয়েছেন। তিনি তাদের মাঝে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি এবং অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য প্রেরণা দিয়ে গিয়েছেন।

এর প্রমাণ মিলে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থে মুসলিম জাতির উদ্দেশ্যে আহবান করা থেকেই। ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত তাঁর “সাত সাগরের মাঝি” কাব্যগ্রন্থে বলেন, আজকে তোমার পাল ওঠাতেই হবে ছেঁড়া পালে আজ জুড়াতেই হবে তালি ভাঙা মাস্তুল দেখে দিক করতালি তবুও জাহাজ আজ ছোটাতেই হবে।

সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা থেকে ইসলামী রেঁনেসায় মোড় নেয়া উপেক্ষার একটি কারণ হতে পারে। যতই উপেক্ষা করা হোক, কবি ফররুখের প্রতিভা নিয়ে কারো সন্দেহ ছিলো না তা স্পষ্ট।

ডক্টর ফজলুল হক সৈকত তার সম্পর্কে বলেন, “ঐতিহ্য, সমাজ-বাস্তবতা, ভাষা প্রকরণ, বিষয় বৈচিত্র্য ও প্রকাশশৈলী- প্রভৃতিতে ফররুখ অনন্য ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি সত্য ও মিথ্যাকে, সামাজিকতা ও মানবিকতাকে, কাব্যের কাঠামো ও প্রকাশরীতিকে আয়ত্ত্ব করেছিলেন শিল্পের দায় থেকে।”

|| চার ||

প্রচন্ড আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন এবং আত্মপ্রত্যয়ী কবি ছিলেন ফররুখ আহমদ। তিনি আভিজাত্য পছন্দ করতেন না। তাই নিজ নাম থেকে সৈয়দ শব্দটি বাদ দিয়ে দেন। তিনি কখনোই নিজের প্রচারনা করতে পছন্দ করতেন না। কেউ তার সাক্ষাৎকার নিতে আসলে বা কোন কারণে সংবর্ধনা দিতে চাইলে তিনি প্রবলভাবে তা প্রত্যাখ্যান করতেন। কেননা তিনি বিশ্বাস করতেন স্তুতিবাক্য নয় বরং মৌলিক সৃষ্টিকর্মই তাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।

মানবসেবা ছিল কবির ধর্ম। এই সম্পর্কে কবিপুত্র আহমদ আখতার “আব্বার কথা” প্রবন্ধে কবি সম্পর্কে বলেন, “আব্বা চাইতেন আমরা মানুষ হই। মানুষ- এই শব্দটিতে বরাবরই অসম্ভব জোর দিতেন। কোন মানুষ সে সময় বুঝিনি। আজও কি বুঝি? এ ব্যাপারে ঘোরতর সন্দেহ আছে। তার সর্বাধিক প্রিয় বিষয় ছিল মানুষ। এই একটি জায়গায় সাহিত্য জীবনের শুরু থেকে আব্বা ছিলেন অচঞ্চল, অনড়।”

এখানে মোহাম্মদ আব্দুল মান্নানের লেখা ‘ফররুখ আহমদের সময়: স্বভাব ও তাঁর আদর্শ’ প্রবন্ধের একটি কথা উল্লেখ না করলেই নয়, “যে আদর্শের দীপ্তিতে ব্যক্তি ফররুখের জীবন ছিল উজ্জ্বল, জীবনের সকল সড়কে কবি সে আদর্শের জয়গান গেয়েছেন। ফররুখ আহমদ কবি হিসাবে, মানুষ হিসাবে এবং মানবতাবাদী হিসাবে সকল আদর্শবাদীদের জন্য এক অত্যুজ্জ্বল আদর্শ।”

|| পাঁচ ||

আমি মনে করি ফররুখকে বাদ দেওয়া মানে আমাদের জাতিসত্তার এবং কবিতার একটি অনিবার্য সংগ্রামী ইতিহাসকে কেটে ফেলে দেওয়া। এই প্রবণতা বোধ করি পৃথিবীর কোনো জাতির ইতিহাসেই পাওয়া যাবে না।

“আমার কাছে সব কবিরাই সমান গুরুত্ব রাখে, কবি-সাহিত্যিকরা বেঁচে থাকে তাঁদের প্রতিভায়, কোনো সংকীর্ণতা, সাম্প্রদায়িকতা কখনোই পছন্দ করি না, তাই প্রতিটা কবিকেই আমি পড়ি, তাঁদের সৃষ্টি কর্ম নিয়ে চিন্তা ফিকির করি, কবি ফররুখ আমার সেই তালিকার শীর্ষে”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *