ফুল চাষীদের কাঁটার জীবন

চলছে করোনা কাল। দিশেহারা কৃষক। বিশেষ করে দেশের ফুলের রাজধানী খ্যাত গদখালীতে নেই কৃষকের মুখে হাসি। করোনায় বিক্রি হয়নি ফুল। অবিক্রিত কোটি টাকার ফুলক্ষেত খাওয়ানো হয়েছে গবাদি পশু দিয়ে। এর সাথে যোগ হয়েছে এবারের আম্পানের বিপর্যয়। এবারেই প্রথম বড় কোন ঝড়ের কবলে পড়ে গোটা যশোর অঞ্চল। বিশেষ করে গদখালীর ফুলের পলি হাউজ বা ফুল চাষের বিশেষ ঘরগুলো প্রায় পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। সেখানকার অটোমেটিক ঝর্ণা ও এসি সিস্টেমও সম্পূর্ণ বিকল হয়ে গেছে। আর যেটুকুও অবশিষ্ট আছে তাতে মেরামত করতে লাগবে লাখ লাখ টাকা। এদিকে ক্ষেতে নেই ফুল। দাম মোটামুটি ভালো থাকলেও এসব নতুন করে ফুল চাষ সহসাই করতে পারছেন না কষকেরা। এ যেন কাঁটার জীবনে বসবাস তাদের।
যশোর গদখালীর একাধিক কৃষকের সাথে কথা বলে জানা গেল, এবার বছরের শুরুতে ফুলের আবাদ অনেক বেশি থাকলেও বর্তমানে আগের তুলনায় প্রায় অর্ধেকেরও কম জমিতে ফুল গাছআছে। বাকি ফুল গাছ করোনায় ও আম্পানে নষ্ট হয়ে গেছে। আম্পানের কারণে ধুলি বালি কিংবা নষ্ট ফুল গাছের গোড়ার কারণে আবাদ করা যায়নি। এজন্য আম্পান পরবর্তীতে সে জমি গুলোতে ধানচাষ করেছেন কৃষকদের কেউ কেউ। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস ও ঘূর্ণিঝড় আম্পানের কারণে গত প্রায় ৭ মাসে ফুলচাষি ও ব্যবসায়ীদের শত কোটির বেশি টাকার ক্ষতি হয়েছে। হতাশায় ভেঙে পড়েছেন ফুল চাষের ওপর নির্ভর এলাকার হাজার হাজার মানুষ। লক ডাউনের আগে যে পরিমাণ ফুল ছিল তাও বিক্রি করতে না পেরে মাথায় হাত তাদের। একারণে বাগান বাঁচাতে ফুল কেটে গরু-ছাগলকে খাইয়েছিলেন তারা।
সরেজমিনে দেখলাম, গদখালীর যেসব জমিতে আগে ফুল চাষ করা হতো সেগুলো খালি পড়ে আছে কিংবা শুধু গাছের মরা ডাল পড়ে আছে। পূর্বে অক্টোবর নভেম্বর মাসে গদখালী ফুলের সুবাসে মৌ মৌ করলেও এবার সেটিও নেই। অধিকাংশ জমিতে ফুলগাছ আছে কিন্তু ফুল নেই। তাকলেও একটি দুটি ফুল। তবে নতুন উদ্যেমে ব্যস্ত সময় পার করছেন গদখালীর চাষিরা। বীজতোলায় চারা তৈরি কিংবা নতুন করে ফুল গাছ লাগানোর কাজে চাষি ও শ্রমিকেরা ব্যস্ত সময় পার করছেন।
যশোর জেলার পশ্চিমের উপজেলা ঝিকরগাছা ও শার্শা থানার ৭৫টি গ্রামের প্রায় সাড়ে ৬ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ করা হয় হরেক রকমের ফুল। ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী ইউনিয়নের পানিসারা, হাড়িয়া, কৃষ্ণচন্দ্রপুর, পটুয়াপাড়া, সৈয়দপাড়া, মাটিকুমড়া, বাইসা, কাউবা, ফুলিয়া আর শার্শার নাভারন, উলাশি, গদখালী ও শ্যামলাগাছি গ্রামে ফুল চাষ বেশি হয়। এসব জমিতে চাষ হতো প্রায় শতাধিক রকমের ফুলের। এর মধ্যে রয়েছে গাঁদা, গোলাপ, গ্লাডিওলাস, রজনীগন্ধা, জারবেরা, রথস্টিক, জিপসি, গ্যালেনডোলা, কসমস, ডেইজ জিপসি, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকাসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফুল। আগে গদখালীর যেকোনো দিকে তাকালেই চোখে পড়ে একটার পর একটা ফুলের বাগান। তবে এখন আর সেদৃশ্য নেই। হাসি নেই কৃষকের মুখে।

আম্পান ঝড়ের তাণ্ডবে বেশিরভাগ ফুলগাছ উপড়ে ও ডালপালা ভেঙে গেছে। অনেক জায়গায় ফুল গাছ দুমড়ে মুচড়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এখন দোকানপাট খুললেও ক্ষেতে তো আর গোলাপ নেই। যতটুকু আছে তা দিয়ে খরচের টাকার অর্ধেকও উঠবে না। অত্যন্ত খারাপ অবস্থার মধ্যে আছি আমরা ফুলচাষিরা।’ ঝড়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে জারবেরা ফুলের। প্রতি একর জারবেরা ফুল চাষ করতে ৩৬ লাখ টাকা খরচ হয়। এর জন্য যে পলিশেড বানাতে হয় তা তৈরি করতে প্রচুর টাকা খরচ হয়। কিন্তু আম্পানের কারণে তা লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। এছাড়া রজনীগন্ধা চাষে একর প্রতি খরচ আড়াই লাখ টাকা, গোলাপ সাড়ে চার লাখ টাকা, গ্লাডিওয়াস চার লাখ টাকা, গাঁদা চাষে দুই লাখ ত্রিশ হাজার টাকার মতো খরচ হয়।
যশোর ঝিকরগাছা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. মাহবুব আলম রনি এর তথ্যমতে, শুধু করোনার কারণে ফুল বেচতে না পারায় প্রায় ৩০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে কৃষকদের। আর ঘূর্ণিঝড় আম্পানের কারণে ক্ষেতের ফুল ও শেডের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২০ কোটি টাকা। অর্থাৎ করোনা এবং আম্পানে মোট ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৫০ কোটি টাকা।
উল্লেখ্য, ১৯৮৪ সালের দিকে এখানে ফুলের চাষ শুরু হলেও গত দুই দশকে ফুল চাষে স্থানীয় কৃষকদের আগ্রহ বেড়েছে কয়েকগুণ। বর্তমানে এলাকার প্রায় ছয় হাজার কৃষক জড়িত রয়েছে ফুলচাষে। স্বাভাবিক সময়ে শুধুমাত্র ঝিকড়গাছা উপজেলায় প্রায় ৫০ লাখ টাকার ফুলের বেচাকেনা চলত।

##
ছবি ক্যাপশন:
২,৫,৬ : ভেঙ্গে পড়ে গেছে পলিশেড, যেখানে চাষ করা হতো জারবেরা।
৪,৭ : নতুন ভাবে েেজগে উঠেছে কৃষকের আশা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *