আরেকজন এডওয়ার্ড জোনারের অপেক্ষায়

৪ মে ১৭৯৬। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে দিনটি খুবই স্মরণীয়। গো-বসন্তে আক্রান্ত এক মহিলার ফোঁড়া থেকে (আক্রান্ত স্থান) পুঁজ সংগ্রহ করে তা টিকা হিসেবে আট বছরের একটি সুস্থ বালকের শরীরে প্রবেশ করানো হয়। বালকটির নাম জেমস ফিপস।

চিকিৎসক বললেন, এ টিকা নিলে ভবিষ্যতে তার আর কোনোদিন বসন্ত হবে না। অভিভাবকরা নানা আশঙ্কায় আপত্তি করলেও শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন।

তখন গুটিবসন্ত মানেই মহামারী। আক্রান্তদের প্রতি দশজনে অন্তত তিনজন মারা যেত। এছাড়া বেঁচে যাওয়াদের শরীর এক বিশ্রী রূপ ধারণ করত। টিকা দেয়ার পর চিকিৎসক প্রতিদিন ছেলেটিকে দেখতে আসতেন। ছেলেটির শরীরে বসন্ত দেখা দিল কিনা তা তার জানা চাই। কিন্তু না, সে সুস্থই রয়েছে। কিছুদিন পর সেই গ্রামে বসন্ত রোগ দেখা দিল। দেখতে দেখতে তা মহমারী আকার ধারণ করল। গ্রামের অনেক লোক মারা গেল। কিন্তু অবাক কাণ্ড, সেই টিকা দেয়া ছেলেটির কিছুই হল না! এ এক অবিশ্বাস্য ঘটনা।

চলল এ নিয়ে গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা। দু’বছর ধরে অনেক পরীক্ষা শেষে ১৭৯৮ সালে ওই চিকিৎসক-গবেষক তার নতুন আবিষ্কারের কথা প্রকাশ করলেন। সমসাময়িক ডাক্তাররা তার কথা হেসে উড়িয়ে দিলেন। তার কর্মকাণ্ড নিয়ে এমনকি ব্যঙ্গচিত্রও প্রকাশ করা হল। গরুর পুঁজ নিয়ে টিকা দেয়ায় মানুষের মুখ গরুর মতো হয়েছে। শিং গজিয়েছে, আরও কত কী! তিনি কিন্তু বসে নেই। নিবিষ্টমনে কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। একসময় রয়েল সোসাইটিতেই পাঠালেন তিনি তার গবেষণাকর্ম। কিন্তু দুর্ভাগ্য, অমনোনীত হয়ে তা ফেরত এলো।

তিনি দমলেন না। তার নিজের ছেলেকে তিন-তিনবার টিকা দিলেন। কাছের একটি গ্রামে অনেক গরিব লোক বাস করত। তিনি তাদের সবাইকে টিকা দিয়ে দিলেন। ফলে দেখা গেল, সেই পাড়ায় আর কারও বসন্ত হল না। তখন ক্রমে লোকে তার মতে আস্থাশীল হতে থাকল। দু’-একজন সম্ভ্রান্ত লোক নিজের ছেলেমেয়েকে টিকা দেয়ার জন্য তার কাছে নিয়ে আসতে শুরু করলেন।

ওই চিকিৎসকের নাম এডওয়ার্ড জেনার (১৭ মে ১৭৪৯-২৬ জানুয়ারি ১৮২৩)। তিনি একজন ব্রিটিশ চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী, যিনি গুটিবসন্ত রোগের ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পথিকৃৎ; যা এই দুনিয়ার প্রথম ভ্যাকসিন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে রেকর্ড গড়লেন তিনি।

এডওয়ার্ড জেনার জাতিতে একজন ইংরেজ। তার জন্ম ও কর্মস্থল ইংল্যান্ডের বার্কলিতে। বার্কলি থেকেই গুটিবসন্ত নিয়ে তার গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার শুরু। যদিও ছাত্রজীবন থেকেই ভয়াবহ গুটিবসন্ত রোগটি সম্পর্কে তার মনে আগ্রহ ও কৌতূহলের সৃষ্টি হয়। প্রতিকূলতা ও নানা বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হন তিনি এবং সাধ্যানুযায়ী সবকিছু মোকাবেলা করেন। এগোতে থাকেন এবং শেষ পর্যন্ত সফলতার মুখ দেখেন।

জেনার ছিলেন ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়নের খুবই প্রিয়ভাজন। নেপোলিয়ন নিজে টিকা নিলেন। তখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ জেনারকে সম্মানিত করতে লাগল। দুনিয়াজুড়ে তোলপাড় শুরু হল। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণাকর্মের জন্য ৩০ হাজার পাউন্ড মঞ্জুর করল। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, যে তারিখে এডওয়ার্ড জেনার বালক জেমস ফিপসকে গুটিবসন্তের টিকা দিয়েছিলেন (৪ মে), জার্মানি প্রতি বছর সেই তারিখকে একটা জাতীয় পর্ব দিন হিসেবে ধার্য করল।

ডা. জেনার তার আবিষ্কারের পদ্ধতি লুকিয়ে রাখলেন না। পৃথিবীর নানা জায়গা থেকে নানা প্রশ্ন আসতে লাগল। তিনি ঠিকভাবে সব কথা বুঝিয়ে দিতে লাগলেন। অনেক দেশ আইন করে টিকা নেয়া বাধ্যতামূলক করল।

জেনারের আবিষ্কারে বিশ্বজুড়ে সাড়া পড়ে যায়। এমনকি তিনি মারা যাওয়ার পরও চলতে থাকে গবেষণা কার্যক্রম। দুনিয়া স্বস্তি পেতে থাকে। তার মৃত্যুর ৫৭ বছর পর ১৯৮০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষণা দেয় যে, গুটিবসন্ত রোগটি শতভাগ নির্মূল সম্ভব হয়েছে। শেষবার এ রোগে আক্রান্ত রোগী পাওয়া গিয়েছিল ১৯৭৭ সালে।

এভাবেই আবিষ্কৃত হয় মরণঘাতী ছোঁয়াচে গুটিবসন্ত রোগের টিকা। আর এর সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে আছে মহাজন এডওয়ার্ড জেনারের নামটি। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি কথা রয়েছে- প্রতিকারের চেয়ে কোনো রোগকে প্রতিরোধ করতে পারাটাই হল সবচেয়ে উত্তম। ডা. জেনার আবিষ্কৃত প্রতিরোধ ব্যবস্থা অনুসরণ করে গুটিবসন্ত রোগকে পৃথিবী থেকে বিতাড়িত করতে প্রায় ২০০ বছর লেগে যায়। এ সময়ে বিশ্বে আনুমানিক ৩০ কোটি লোকের মৃত্যু হয় এই মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে।

বিজ্ঞানী ও গবেষকরা বসে নেই। দুনিয়াজুড়ে বিরাজমান করোনাভাইরাসের আগ্রাসী থাবায় জনজীবন বলতে গেলে বিপন্ন হয়ে পড়েছে। সবকিছুই আজ স্থবির, স্তব্ধ। আমাদের আশা, মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ পোলিও, হাম, যক্ষা, হেপাটাইটিস-বি, হুপিং কাশি, ধনুষ্টংকারসহ যাবতীয় রোগের মতোই করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনও সহসা মানুষের হাতের নাগালে চলে আসবে।

দুনিয়ার তাবৎ বিজ্ঞানী ও গবেষকরা নিরলসভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের ঘাম-ঝরা তৎপরতার দিকে তাকিয়ে আছে সারা বিশ্ব, গোটা মানবকুল। আমরা জানি না বিশ্বের কোন প্রান্ত এবং কার মুখ থেকে করোনাভাইরাস মোকাবেলার ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ‘ইউরেকা’ শব্দটি উচ্চারিত হবে। গোটা পৃথিবী এমন একটা আশাজাগানিয়া বার্তা শোনার জন্য অপেক্ষমাণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *